Advertisement
মেনু
নিউজ ফাস্ট
বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা
কনভার্টার

প্রশাসক নিয়োগের পরও রাসিকের নাগরিক সেবা নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ

স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশ : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 70 বার পঠিত
প্রশাসক নিয়োগের পরও রাসিকের নাগরিক সেবা নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ
ছবি : সামান্য বৃষ্টিতে রাজশাহী মহানগরীর চিত্র। -ছবি: নিউজ সিক্সটিন

বিশেষ প্রতিবেদন: একসময় পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও সবুজ নগরী হিসেবে দেশজুড়ে সুনাম ছিল রাজশাহীর। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই পরিচিত চিত্র। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নিয়মিত সেবা ও সার্বিক কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা, আবার কোথাও মশার তীব্র উপদ্রব—সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে জনজীবনে। পাশাপাশি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারগুলোর সংলগ্ন এলাকায় কাজের ধীরগতির কারণে নিত্যদিন তৈরি হচ্ছে যানজট ও তীব্র জনদুর্ভোগ। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রতিনিধিহীন নগর ব্যবস্থাপনা ও তার জবাবদিহিতা নিয়ে।

প্রতিনিধিত্বহীন নগর কাঠামো ও প্রশাসনিক রদবদল:
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহীর তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ১৯ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলরদেরও অপসারণ করা হয়। ফলে রাজশাহী মহানগরের ৩০টি ওয়ার্ডের নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

কাউন্সিলর না থাকায় জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, রাস্তা ও ড্রেনের মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মশক নিধনের মতো দৈনন্দিন মৌলিক সেবা পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় অভিযোগ জানানোর মতো কোনো সরাসরি প্রতিনিধি না থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

মেয়র অপসারণের পর সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক দায়িত্ব কয়েক দফায় হস্তান্তরিত হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ মাহফুজুর রহমান রিটন। তবে নাগরিকদের অভিযোগ—প্রশাসনিক কাঠামো বহাল থাকলেও মাঠপর্যায়ে নাগরিক সেবার দৃশ্যমান কোনো মানোন্নয়ন ঘটেনি।

জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা:
একটানা ভারী বৃষ্টি তো দূরের কথা, অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পথচারী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা পোহাচ্ছেন চরম দুর্ভোগ।

নগরবাসীর মতে, শুধু বৃষ্টি হলেই পানি সরানোর অস্থায়ী উদ্যোগ নিলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোথায় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, কোন ড্রেনের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কম, কিংবা কোথায় অবৈধ দখল ও বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—তা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

মশক নিধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রচার আছে, ফল নেই:
মশক নিধন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কিংবা ঝটিকা অভিযানের খবর নিয়মিত পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ে এর ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে কেবল ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়; ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা, জমা পানি অপসারণ, পরিত্যক্ত পাত্র-জলাধার শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত লার্ভা ধ্বংসের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ওয়ার্ডভিত্তিক এসব কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

একইভাবে রাসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। নিয়মিত বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, সড়ক ঝাড়ু দেওয়া এবং ড্রেনের পলি অপসারণের মতো মৌলিক সেবাগুলো থেকেও অনেক এলাকার মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন।

ফ্লাইওভারের ধীরগতি ও দীর্ঘায়িত দুর্ভোগ:
রাজশাহীতে একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে কাজের চরম ধীরগতি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৩৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচটি ফ্লাইওভারের ধীরগতির কাজের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম খেসারত দিতে হচ্ছে।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।

মেগা প্রকল্পের আড়ালে আড়াল হচ্ছে কি মূল সেবা?
ফ্লাইওভার বা দৃষ্টিনন্দন পরিকাঠামোর মতো বড় উন্নয়ন প্রকল্প অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহরের মানদণ্ড শুধু মেগা প্রকল্প দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মৌলিক সেবাগুলো হলো:

   পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ধুলামুক্ত সড়ক

   কার্যকর ও পরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা

   দ্রুগামিতা ও জলাবদ্ধতামুক্ত পরিবেশ

   নিয়মিত ও সমন্বিত মশক নিধন

   নিরাপদ সড়ক ও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা

   আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

   নাগরিক সনদ ও জন্মনিবন্ধন প্রদানে দ্রুত প্রশাসনিক সেবা

   ওয়ার্ডভিত্তিক সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের ব্যবস্থা

এসব প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত না হলে বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ উপভোগ করতে পারে না।

জবাবদিহিতার প্রশ্ন ও প্রত্যাশা:
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সার্বিক সাফল্য কেবল প্রশাসকের ওপর এককভাবে নির্ভর করে না। প্রকৌশল, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য, রাজস্ব ও নগর পরিকল্পনা বিভাগকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক নেতৃত্বের নয়, প্রশ্ন উঠছে পুরো নগর ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কার্যকরতা নিয়ে।

সিটি করপোরেশনের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নগরবাসী কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর চান:

   প্রতিদিনের নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির হার কত?

   কোন ওয়ার্ডে ঠিক কতটি সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করা হয়েছে?

   উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে কি না?

   নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত কত টাকা ও সময় ব্যয় হচ্ছে?

এসব তথ্য যদি নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়, তবে সিটি করপোরেশনের ওপর নগরবাসীর আস্থা ফিরবে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

গ্রিন সিটি ও ক্লিন সিটি হিসেবে রাজশাহীর যে ঐতিহাসিক সুনাম ছিল, তা টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল নতুন নতুন বড় প্রকল্প হাতে নিলেই হবে না, বরং দৈনন্দিন নাগরিক সেবার ভিত্তিকেও মজবুত করতে হবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা—প্রশাসক রূপরেখা তৈরি করে দ্রুত এসব সংকটের কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবেন।

আরও পড়ুন : প্রশাসক, নিয়োগ, রাসিক, নাগরিক, সেবা, অসন্তোষ,পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, সবুজ নগরী, দেশজুড়ে, রাজশাহী, সিটি করপোরেশন

জাতীয় থেকে আরও দেখুন

নিচে স্ক্রল করলে পরবর্তী সংবাদ আসবে