রাবি-রেলওয়ে বিরোধ: বারবার উত্তেজনা, দায় কার?
নূর মোহাম্মদ সাদ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী ও রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ যেন থামছেই না। কয়েক মাসের ব্যবধানে একের পর এক অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি অবস্থান, রেললাইন অবরোধ ও সর্বশেষ রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে
ভাঙচুরের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার মধ্যে বিরোধ কেন বারবার সংঘাতে গড়াচ্ছে?
সর্বশেষ রোববার রাতে রাজশাহী রেলস্টেশনে রাবির এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। আহত শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঘটনা তদন্তে রেলওয়ের পক্ষ থেকে চার সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ?
চলতি বছরের জুলাইয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রেললাইন অবরোধ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত টিটিই-কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে রেলওয়ে জানিয়েছিল। অবরোধের কারণে রাজশাহীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রুটের ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায় এবং শত শত যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও টিটিই-দের আচরণ নিয়ে এর আগেও একাধিকবার সমস্যা তৈরি হয়েছে। চেন টানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীকে হয়রানি, রেল নিরাপত্তা সদস্যদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগসহ বেশ কিছু ঘটনার কথা তারা সামনে আনছেন। তবে এসব পুরোনো অভিযোগের সবগুলো বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
এদিকে সর্বশেষ ঘটনার পর শুধু রেলওয়ে কর্মীদের ভূমিকা নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্টেশনের সিসিটিভি, হেল্প ডেস্ক, জানালার কাচসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি আন্তঃনগর ট্রেন স্টেশনে অবস্থানকালে সেখানে নারী ও শিশুসহ যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলেও পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ যেমন গুরুতর, তেমনি প্রতিবাদের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাঙচুর, রেললাইন অবরোধ এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগে ফেলার ঘটনাও কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
রেলের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন
রাজশাহী ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রেললাইন ভেঙে যাওয়া এবং হরিয়ান এলাকায় ট্রেনের দুটি চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছিল।
এর আগে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের রেলপথের দুর্বলতা ও বারবার লাইনচ্যুতির ঘটনা নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
রাজশাহী রেলস্টেশনে ডিজেল সরবরাহের পাইপ ফেটে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল।
এসব ঘটনা আলাদা আলাদা হলেও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তাহলে দায় কার?
সর্বশেষ ঘটনাকে শুধু ‘শিক্ষার্থীদের ভাঙচুর’ অথবা শুধু ‘রেলওয়ের কর্মীদের হামলা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
একজন শিক্ষার্থীর ওপর যদি রেলওয়ে কর্মী বা নিরাপত্তা সদস্যের বেআইনি হামলার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে শিক্ষার্থীদের কোনো অংশ যদি স্টেশন, রেললাইন বা রাষ্ট্রীয় সম্পদে ভাঙচুর করে থাকে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও দায় নির্ধারণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, রেলওয়ের পাশাপাশি বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে কাউকে দায়ী না করার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন জরুরি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রেলওয়ের মধ্যে বারবার এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে?
রেলওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
সাময়িক বরখাস্তের পর অভিযুক্ত কর্মচারীকে দায়িত্বে ফেরানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই করা হয়?
বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন ও রাজশাহী রেলস্টেশন দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় ব্যবস্থা কেন কার্যকর হয়নি?
সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি ঘটনার দায় কি নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, একটি ঘটনার পরপরই ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে?
সর্বশেষ ঘটনায় রেলওয়ে ও বিভাগীয় প্রশাসনের দুটি তদন্ত প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে যদি আগের ঘটনাগুলোরও নথি, অভিযোগ ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে বোঝা সম্ভব হতে পারে সমস্যাটি ব্যক্তির আচরণে, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায়, নাকি দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগঘাটতিতে।
প্রশ্ন উঠেছে পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই কি এমন ঘটনা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার’ মতো দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া না গেলেও বিগত সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায় নিযোগকৃতদের নিয়ে তদন্ত সহ নজরদারি প্রয়োজন।
অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, রাজশাহীতে রেলওয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিরোধ এখন আর দুই পক্ষের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সাধারণ যাত্রীর নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং পুরো অঞ্চলের রেল যোগাযোগ। ফলে দায় যারই হোক, বারবার সংঘাতের বদলে স্থায়ী সমাধান এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।