মেহেরপুরে সারের নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আশায় ছুটছেন অসংখ্য আবেদনকারী। তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলতে সক্রিয় একটি চক্র। নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়ে প্রভাবশালী একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

মেহেরপুর কৃষিভিত্তিক জেলা হওয়ায় এখানে সারের ব্যবহার বেশি। এ জেলায় সারের চাহিদা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রয়োজনের দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬৬ জন সার ডিলারের জায়গায় রয়েছেন ১১৫ জন সার ডিলার। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে সার ডিলার নীতিমালা না মেনে অধিকাংশ ডিলারশিপ মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের সুপারিশে দেওয়া হয়েছে। ফলে একই পরিবারে একাধিক সদস্য, মৃত ব্যক্তির নামে, ভিন্ন ব্যক্তির নামে ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এদিকে জেলায় চাহিদার দুইগুণ বেশি সার ডিলার থাকার পরও মেহেরপুরে সারের সংকট তীব্র। ১০ কেজি সারের জায়গায় ২ কেজি সারও পাচ্ছেন না কৃষক। ১১শ টাকা বস্তা সার পাওয়া যাচ্ছে না ২৭শ টাকাতেও। কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সারের অভাবে এবার কৃষির লক্ষ্যমাত্রা বা উৎপাদন অনেক কম হবে।

সারের এই চলমান সংকট নিরসনে দেশের অন্যান্য জায়গার মতো মেহেরপুরে আরও ২২ জন সার ডিলার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ২২ জন নতুন ডিলারের বিপরীতে আবেদন করেছেন ৬২৬ জন ব্যবসায়ী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সার ডিলারশিপের আবেদন মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে এখন ঘুষের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার বাণিজ্য সহজ হয়েছে চক্রটির জন্য।

কে বা কারা এই ঘুষবাণিজ্য করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারী জানান, নাম বললে ঘুষ বাবদ টাকাও ফেরত পাব না, সার ডিলার লাইসেন্সও হবে না।

এদিকে এমন অভিযোগ শোনার কথা জানিয়ে মেহেরপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুর হোসেন বলেন, নতুন সার ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে ঘুষবাণিজ্য দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটা বন্ধ না হলে আবারও অব্যবসায়ী কালোবাজারিদের হাতে চলে যাবে সার ডিলারশিপ ব্যবসা।

এ বিষয়ে মেহেরপুর সদর উপজেলার বুড়িপোতা ইউনিয়নের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, আমিও নতুন সার ডিলারশিপ পেতে সরকারের সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু একটি প্রভাবশালী চক্র জানিয়েছে, ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা না দিলে ডিলারশিপ পাওয়া যাবে না। তবে তিনি সেই চক্রটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।

মেহেরপুর সদর উপজেলার আমদাহ ইউনিয়নের আবেদনকারী নফিজ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর আবেদনের শর্ত যাচাই করতে কর্মকর্তারা গুদাম পরিদর্শনে গেলে পরিদর্শক কর্মকর্তার সঙ্গে জেলা বিএনপি সেক্রেটারির ভাই ছিলেন। মূলত তার মৌখিক সিলেকশনের পরই আবেদনে চুক্তিনামা অনুযায়ী গুদাম আছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে। একই অভিযোগ জানালেন সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের আবেদনকারী আসাদুজ্জামানও।

নতুন ডিলারশিপ নিয়ে ঘুষবাণিজ্যের বিষয়টি শুনেছেন উল্লেখ করে মেহেরপুর পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস বলেন, সরকারবিরোধী অংশ এবং বিএনপির সুবিধাবাদী একটি অংশ নতুন সার ডিলার নিয়োগ এবং সার বিপণন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য নস্যাতের চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রাণী রায় বলেন, নতুন সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এবং নীতিমালা অনুসরণ করেই হচ্ছে। সব ধরনের প্রভাবমুক্ত হয়েই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নাম পাঠানো হবে। এক্ষেত্রে কেউ প্রলোভনে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং কেউ ঘুষ প্রদানের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ না করলে সেই দায় প্রশাসন নেবে না বলেও তিনি জানান।