গত মাসে একাধিক জেলাজুড়ে ভয়াবহ বন্যার পর বিশ্বনেতা ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে অভাবনীয় সহায়তার ঢল নেমেছে। এটি কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, আন্তঃসরকার ফোরামগুলো এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নবায়নের পথ ধরে নেপাল বিশ্বমঞ্চে বিশ্বস্ততার যে স্থান তৈরি করতে পেরেছে, তার বলেই এই সহানুভূতি ও সহায়তা এত দ্রুত পৌঁছেছে। উদ্ধারকাজ, টেকসই পুনরুদ্ধার ও পুনর্নির্মাণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার এই সময়ে নেপালের হাতে রয়েছে এক অনন্য নৈতিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা। নেপাল কি এই মুহূর্তকে জলবায়ু বিপর্যয়ের এই নির্মম মাত্রার সঙ্গে মানানসই সমাধান বাস্তবায়নে পুরো বিশ্বকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে পারে?
বিশ্ব আজ জলবায়ুর যে বৃহত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি, নেপাল একেবারে তার সামনের কাতারে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর লিমিটিং ওভারশুট প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এখন এক অনিবার্য বাস্তবতা। আর চরম জলবায়ু বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত দেশগুলোর জন্য এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। তাপদাহ, বন্যা, দাবানল, খরা এবং হিমবাহ ধসের মতো ঘটনা আজ নজিরবিহীন তীব্রতা নিয়ে আঘাত হানছে।
নেপালসহ পুরো উন্নয়নশীল বিশ্ব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আর তা হলো মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন এবং জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের ব্যবস্থা একই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সত্ত্বেও এগুলো বিচ্ছিন্ন ও আলাদা রয়েছে। বড় ধরনের বিপর্যয় অল্প সময়ের জন্য মনোযোগ আকর্ষণ করে। দেখা যায়, ক্ষয়ক্ষতি ও জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার খরচ কমানোর ক্ষেত্রে দুর্যোগ প্রস্তুতির প্রমাণিত অবদান থাকা সত্ত্বেও খাতটিতে সব সময় অর্থায়নের ঘাটতি থেকে যায়। দুর্যোগের আগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অরক্ষিত থাকে। দুর্যোগের সময় তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর দুর্যোগের পর তারা যথাযথ সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। জলবায়ু বিপর্যয়ের এই ঘনঘটা ও ভয়াবহতা স্পষ্ট বার্তা দেয়– সংকটের আগে, চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে এই আলাদা হয়ে থাকা ব্যবস্থাগুলো ভাঙতেই হবে।
বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় অর্থায়ন, জলবায়ু তহবিল, বেসরকারি মূলধন এবং ঝুঁকিমুক্তকরণে উদ্ভাবনী উপায়গুলো কাজে লাগাতে নেপালকে বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সহনশীলতা তৈরিতে বিশ্বসেরা দক্ষতাগুলো যুক্ত করতে হবে। আর অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হিসেবে বহুমুখী ঝুঁকি-সহনশীলতা বাস্তবে কেমন হতে পারে– তা এই পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে প্রদর্শন করতে হবে। এই বিপর্যয় শেষ নয়, সামনে এমন আরও আসবে। জাতীয় ট্র্যাজেডিকে বৈশ্বিক সংস্কারে রূপ দিতে বহুমাত্রিক কূটনীতির প্রয়োজন। আগামী মাসগুলোতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, তুরস্কের আন্তালিয়ায় কপ৩১ এবং অন্যান্য ফোরামের মাধ্যমে এই সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক মনোযোগ টানার সুযোগ দিলেও আসল কূটনৈতিক কাজগুলো ঘটে মূল হলের বাইরে। যেমন– নেতাদের সংলাপ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং মিডিয়া প্রচারের মাধ্যমে। ঠিক যেমনটি পাকিস্তান ২০২২ সালের বন্যার পর ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি তহবিল গঠনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যবস্থা নিয়েছিল। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন হলো সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা এবং কপ৩১-এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আনুষ্ঠানিক কপ৩১ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতি বেশ ধীর। নেপালকে অবশ্যই নিজের উদ্যোগগুলোতে সমর্থন পাওয়ার জন্য ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন মহলের সমর্থন আদায় করা এবং খবরের শিরোনাম থেকে বিষয়টি হারিয়ে যাওয়ার পরও সেই সমর্থন বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঠিক এখানেই নেপালের রাজনৈতিক নবায়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশ একটি জেঁকে বসা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা দেখিয়েছে, সে একই মানসিকতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নিয়ে আসতে পারে। নেপালের সংকটে বিশ্বজুড়ে সমর্থনের যে ঢল নেমেছে– সাধারণ নাগরিক ও কমিউনিটি কিচেন থেকে শুরু করে শীর্ষ ক্রীড়া লিগ পর্যন্ত; তা প্রমাণ করে– বৈশ্বিক অনুভূতি এখনও জীবন্ত।
ববিতা বিস্ট: গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সাবেক উপপরিচালক
সাধারণ
নেপাল জলবায়ু বিপর্যয়ে বৈশ্বিক সাড়া পর্যাপ্ত?
Source
সমকাল
· নেপাল জলবায়ু বিপর্যয়ে বৈশ্বিক সাড়া পর্যাপ্ত?