আজিকার সমাজজীবনের নানা ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া অনেকে প্রশ্ন তুলিতেছেন, এ কোন সমাজে আমরা বাস করিতেছি? সভ্যতার এতটা পথ পাড়ি দিয়াও কি মানুষ আবার সেই বর্বরতার দিকেই ফিরিয়া যাইতেছে? অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে যে, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কোথাও যেন স্বস্তি বা নিরাপত্তা নাই। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার ১৩ বছর বয়সি সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যার শিকার হইয়াছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আইফোন ছিনাইয়া লওয়াকে কেন্দ্র করিয়া বন্ধুর হাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়া থাকিতে পারে। তদন্তে প্রকৃত সত্য নিশ্চয়ই বাহির হইবে; কিন্তু প্রশ্ন থাকিয়া যায়, একটি শিশু মায়ের আইফোন লইয়া বন্ধুদের সহিত ছবি তুলিবার আনন্দে ও বিশ্বাসে ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল, অথচ সেই বন্ধুর হাতেই তাহার প্রাণ গেল-ইহার চাইতে মর্মান্তিক বিষয় আর কী হইতে পারে! একটি মোবাইল ফোন বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, এমনকি মানুষের জীবনের চাইতেও বড় হইয়া যাইতেছে-এ কোন বর্বর সমাজ?
শুধু এই একটি ঘটনাই নহে, চারিদিকের চিত্র যেন একই প্রশ্ন ছুড়িয়া দিতেছে। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া মারামারি, ছিনতাই-ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানি-কী না ঘটিতেছে? সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই যাত্রীর তুমুল মারামারির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইয়া পড়িতে দেখা গিয়াছে। খুলনায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে পিটাইয়া হত্যার অভিযোগ উঠিয়াছে-অভিযোগ, সে মেসে ভাত চুরি করিয়া খাইয়াছিল। ইহারও পূর্বে চুরির অভিযোগে এক জনের পিঠে ইট বাঁধিয়া নির্যাতন করা হয় এবং পরে তাহার মৃত্যু ঘটে। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, দুই মুঠো ভাত কিংবা সামান্য চুরির অভিযোগের শাস্তি কি ‘মানুষের জীবন সংহার’ হইতে পারে? এই কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত সমাজ?
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতির ভূমিকা থাকিতে পারে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির পিছনে; কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করিয়া কি দায় শেষ করা যাইবে? আমাদের পরিবারে নৈতিক শিক্ষা কতটা আছে; সন্তান কী শিখিতেছে, কাহার সহিত মিশিতেছে, কী দেখিতেছে-অভিভাবকেরা কি তাহার যথেষ্ট খোঁজ রাখিতেছেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কি মানুষ গড়িবার দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করিতেছে? আমরা সম্ভবত ভুলিয়া গিয়াছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নহে, ইহা একটি সামাজিক দায়িত্বও বটে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি সকল কিছু মিলিয়াই একটি সুস্থ সমাজ গঠিত হয়। আমরা কি সেই পথে আছি?
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার লইয়া কম কথা হইতেছে না! পত্রিকান্তরে প্রকাশ, সীমান্তপথে মাদক আসিতেছে, আর তাহার ছোবলে বিশেষত তরুণদের একটি অংশ চলিয়া যাইতেছে বিপথে। আর এই মাদককে কেন্দ্র করিয়া বাড়িতেছে নানা ধরনের অপরাধ। সীমান্তপথে ড্রোন ব্যবহার করিয়া মাদক পাচারের অভিযোগ উঠিয়াছে: ইহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। যে প্রযুক্তি দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কিংবা মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হয়, সেই প্রযুক্তি যদি এই ভূখণ্ডে মাদক পাচারের হাতিয়ারে পরিণত হইয়া উঠে, তাহা হইলে আর রক্ষা থাকিবে না! মূলত এই কারণে সীমান্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নজরদারি এবং ‘বর্ডার রোড’ নির্মাণের ন্যায় দাবিগুলি গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরাইয়া আনিতে হইবে। অপরাধ করিয়া পার পাওয়া যায়-এমন ধারণার অবসান ঘটাইতে হইবে।
বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, কেবল কঠোর আইন দিয়া সমাজকে শান্ত রাখা যায় না। বরং তাহার জন্য সর্বাগ্রে মানুষের বিবেককে জাগাইতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলিয়াছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করিল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করিল।’ (সুরা আল-মায়িদা, ৫: ৩২)। এই একটি বাণীর মধ্যেই মানবজীবনের মর্যাদা কত গভীর, তাহা স্পষ্ট। তবে দেখিবার বিষয়, আমরা সেই শিক্ষা কতটা ধারণ করিতেছি? কেন সামান্য স্বার্থে মানুষের প্রতি মানুষের এত ক্রোধ? কেন একটি ফোন, দুই মুঠো ভাত কিংবা সামান্য সম্পদের জন্য একটি জীবন শেষ করিয়া দিতে হইবে? মানুষ হত্যা কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নকেই হত্যা করে না, ইহা সমাজের বিবেককেও হত্যা করে। অতএব, সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরাইয়া আনিতে হইলে সর্বাগ্রে জাগাইতে হইবে মানুষের ভিতরের মানুষটিকে। কারণ, বিবেকহীন সমাজে আইন থাকিলেও শান্তি থাকে না।