গভীর রাত। ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু একটি ঘরের বাতি জ্বলছে। বিছানার পাশে বসে আছেন ৭৫-ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তি। সামনে সারি সারি ওষুধ, পাশে এক গ্লাস পানি। কাঁপা হাতে ওষুধের পাতা খুঁজছেন আর বারবার তাকাচ্ছেন দরজার দিকে। হয়তো অপেক্ষা– কেউ একজন এসে বলবে, ‘বাবা, এখনও ঘুমাওনি?’ যে হাত একদিন সন্তানের আঙুল শক্ত করে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল; যে মানুষটি সারাজীবন পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের বর্তমান বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সে-ই মানুষটির রাত কাটছে একটি পরিচিত কণ্ঠের অপেক্ষায়। এটি কোনো গল্প নয়; আমাদের চারপাশের নীরব বাস্তবতা। ঘরে সন্তান আছে, আপনজন আছে, টেলিভিশনের শব্দ আছে, মোবাইল ফোনের ব্যস্ততা আছে। শুধু নেই কয়েক মিনিট পাশাপাশি বসার সময়।

বাংলাদেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জনসংখ্যার বয়স কাঠামোও সেই পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং মানসিক সুস্থতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনও বাড়ছে।

আমরা অনেক সময় প্রবীণদের প্রয়োজনকে অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। মাসের শুরুতে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে; ওষুধ কিনে দেওয়া হয়েছে; চিকিৎসার খরচ দেওয়া হয়েছে– দায়িত্ব শেষ। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের হিসাব এত সরল নয়। টাকা দিয়ে চিকিৎসা কেনা যায়, কিন্তু সান্ত্বনা কেনা যায় না। ওষুধ দিয়ে শরীরের ব্যথা কমানো যায়, কিন্তু নিঃসঙ্গতার ব্যথার জন্য কোনো প্রেসক্রিপশন নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বকে এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি ছয়জন মানুষের একজন একাকিত্ব অনুভব করেন। প্রবীণদের মধ্যেও এই সমস্যা উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে এবং জীবনমান ও আয়ুর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আরও উদ্বেগের বিষয়, একাকিত্বকে আমরা অনেক সময় নিছক আবেগের সমস্যা বলে এড়িয়ে যাই। অথচ গবেষণাভিত্তিক বৈশ্বিক প্রমাণ বলছে, দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব হৃদরোগ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, জ্ঞানীয় অবক্ষয় ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের একটি বিশ্লেষণে প্রবীণদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বকে অকালমৃত্যু এবং নানা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই বৃদ্ধ বয়সে ‘সঙ্গ’ কোনো বিলাসিতা নয়। এটি সুস্থ বার্ধক্যের অন্যতম সামাজিক প্রয়োজন। একজন বৃদ্ধ মানুষ হয়তো প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে চান না। তিনি হয়তো শুধু চান, বিকেলে কেউ পাশে এসে বসুক। পুরোনো দিনের একটি গল্প শুনুক। বাজারে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করুক, ‘কিছু লাগবে?’ রাতে ফোন করে বলুক, ‘বাবা, ওষুধ খেয়েছ?’ এই ছোট ছোট প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের উষ্ণতা।

আমাদের পারিবারিক কাঠামোও এই সমস্যা জটিল করে তুলছে। কর্মসংস্থানের জন্য শহর, অন্য জেলা কিংবা বিদেশে যেতে হচ্ছে। এটি সময়ের বাস্তবতা। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এখানেই পরিবারকে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রবীণ বাবা-মায়ের দায়িত্ব মানে শুধু তাদের খরচ বহন করা নয়। তাদের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া; পারিবারিক আলোচনায় তাদের মতামত নেওয়া; নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া এবং তাদের স্মৃতিকে মূল্য দেওয়া– এসবও যত্নের অংশ।

মো. মাজেম আলী মলিন: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ md.magem1974@gmail.com